আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরে আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে। ‘আপনি (খোকন) যে কথাটা বলেছেন, সেটা অ্যাবসলিউটলি আদালত অবমাননার শামিল। যেহেতু আপনি এত বড় একটা কথা বলেছেন, আমি আজকে আর আদালতের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করব না’
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে একটি মামলায় জরিমানার আদেশ নিয়ে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের মধ্যে কথোপকথনের একপর্যায়ে প্রধান বিচারপতিসহ পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এজলাস ছেড়ে গেছেন। মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আপিল বিভাগের আদালতকক্ষে এ ঘটনার পর আর আদালত বসেননি বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চে এ সময় ছিলেন বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম এমদাদুল হক, বিচারপতি ফারাহ মাহবুব এবং বিচারপতি মো. হাবিবুল গণি। ঘটনার পর সাংবাদিকদের সামনে ঘটনার বর্ণনা দেন ব্যারিস্টার খোকন, অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক।
এক মামলায় আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা খরচা আরোপের আদেশের বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি মাহবুব উদ্দিন খোকনের উপস্থাপনের এক পর্যায়ে এজলাস ত্যাগের এই ঘটনা ঘটে।
পরে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আপিল বিভাগের এক নম্বর আইটেমে থাকা মামলায় সকালে নারী আইনজীবীকে কস্ট (খরচা আরোপ) দেওয়া হয়। জরিমানা করা হয় পাঁচ লাখ টাকা। আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় থাকা ১৩ নম্বর মামলা (আইটেম) শেষ হওয়ার পর প্রধান বিচারপতিকে বিনয়ের সঙ্গে বললাম, আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর মামলা খুব একটা হচ্ছে না আপিল বিভাগে।’
আইনজীবীদের আয় কমে গেছে উল্লেখ করে মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘একজন জুনিয়র আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা কস্ট দেওয়া অনেক বেশি হয়ে গেছে। তাঁকে মাফ করে দেন। তখন উনি বললেন, “আমি প্রধান বিচারপতি হওয়ার আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে।” আমি তখন বললাম, ইনকাম ওই সেন্সে কমে গেছে...বোঝাতে চেয়েছি আগে আপিল বিভাগে ১১ জন বিচারপতি ছিল। তিনটা বেঞ্চ ছিল। এখন একটা বেঞ্চ।’
হাইকোর্ট বিভাগের বর্ধিত ভবনের সামনে মাহবুব উদ্দিন খোকন আরও বলেন, ‘একটা মামলা স্টে হলে...সেখানে শুনানি করতে পারছি না। এমনকি চেম্বার আদালতে স্টে করছে, তা হিয়ারিং করতে এক বছর লাগে। ওখানে কোনো মেনশন করা যায় না কেন এই মামলাটা ওপরে ছিল (কজলিস্টে) নিচে গেলে কেন এবং যেহেতু একটা বেঞ্চ, মানুষ দীর্ঘদিন থেকে ন্যায়বিচার পাচ্ছে না, মামলা শুনানি করতে পারছে না। মামলা হলে আইনজীবীদের ইনকাম হবে। কম হোক, বেশি হোক। আমি খুব বিনয়ের সঙ্গে বললাম। আমি চিন্তা করিনি যে উনি এত রিঅ্যাক্ট করবেন। ওনারা তো রাগ–অভিমানের ঊর্ধ্বে বিচার করার কথা। আর আইনজীবীদের প্রতিনিধি হিসেবে আমার অবলিগেশন আছে ওনার কাছে আইনজীবীদের পক্ষে আবেদন করার।’
যা বললেন অ্যাটর্নি জেনারেল
অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, উনি (সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন) আইনজীবীদের কল্যাণে ও স্বার্থে কিছু কথা প্রধান বিচারপতির কাছে বলেছেন বলে দাবি করেছেন। আসলে এমন কোনো কথা আজকের মামলার প্রসিডিংয়ে (কার্যধারা) হয়নি।
এক মামলায় আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা খরচা আরোপের বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি মাহবুব উদ্দিন খোকনের উপস্থাপনের এক পর্যায়ে আজ মঙ্গলবার দুপুর ১২টার পর এজলাস ত্যাগ করেন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন পাঁচ বিচারপতির আপিল বিভাগ। এ বিষয়ে হাইকোর্ট বিভাগের বর্ধিত ভবনের সামনে ব্রিফিং করেন এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন।
পরে নিজ কার্যালয়ে বেলা সোয়া দুইটার দিকে ব্রিফিং করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতি বিচারিক শৃঙ্খলা, সততা প্রাধান্য দেন। কোনো প্রতারণা যদি দেখেন, তা সিরিয়াসলি ডিল (গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন) করেন।
যে কারণে খরচা আরোপ
২০১৩ সালে একজন কাজি নিয়োগ থেকে শুরু হওয়া ঘটনা উল্লেখ করে রুহুল কুদ্দুস বলেন, ‘যেখানে মামলার বাদী পাঁচটি রিট দায়ের করেছেন একই আদেশ চ্যালেঞ্জ করে।...পাঁচটি রিট দায়ের করেছেন অথচ পূর্বে রিজেক্ট হওয়ার আদেশটি পরবর্তী রিটে উল্লেখ করা হয়নি। যে কারণে নারী আইনজীবীকে আজ আপিল বিভাগ ফাইন করেছেন পাঁচ লাখ টাকা এবং রিট আবেদনকারীকে পাঁচ লাখ টাকা, যে টাকা সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে ঢাকা শিশু হাসপাতালে জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। নারী আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী মামলায় সিনিয়র আইনজীবী ছিলেন এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। সকালে যখন আদেশ হয়, তখন নারী আইনজীবী আমার পাশে বসে আদেশটি শুনেছেন; মাহবুব উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন না।’
ওই মামলায় সকাল সোয়া নয়টার দিকে আদেশ হয় বলে জানান অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিনি বলেন, ‘আর এ ঘটনার (এজলাস ত্যাগ) অবতারণা হচ্ছে ১২টা ৩৫ সময়।...অন্য একটি মামলার সময় মাহবুব উদ্দিন খোকন ওই প্রসঙ্গে (খরচা আরোপ) বললেন যে “একজন আইনজীবীকে আপনারা ফাইন করেছেন।” এর পরিপ্রেক্ষিতে তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, “দেখেন, আমরা সবকিছুতে দেখে–শুনে একটা আদেশ দিয়েছি, আমাদের আদেশ আমরা পরিবর্তন করব না। কারণ, ওনাদের (আদালত) বক্তব্য অনুযায়ী সিরিয়াস ফ্রড করা হয়েছে। আদালতের সঙ্গে প্রতারণা এমনকি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ইতিপূর্বের আদেশও ফ্রড করা হয়েছে।” এ পরিস্থিতিতে বললেন, “আপনি (মাহবুব উদ্দিন খোকন) এটা বলবেন না।’”
কথোপকথন ও এজলাস ত্যাগ
অ্যার্টনি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস বলেন, তখন অত্যন্ত অপ্রত্যাশিতভাবে মাহবুব উদ্দিন খোকন বলে ফেললেন যে ‘আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরে আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে।’ বিষয়টি প্রধান বিচারপতি একটু লাইটলি নিলেন। তারপরে বললেন, ‘আপনি (মাহবুব উদ্দিন খোকন) কি এটা মিন করেন? মাহবুব উদ্দিন খোকন অনেকটা সেই একই কথা বলার যখন চেষ্টা করেন, তখন প্রধান বিচারপতি বলেছেন যে ‘আপনি (খোকন) যে কথাটা বলেছেন, সেটা অ্যাবসলিউটলি আদালত অবমাননার শামিল। যেহেতু আপনি এত বড় একটা কথা বলেছেন, আমি আজকে আর আদালতের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করব না।’ এ কথা বলে উনি (প্রধান বিচারপতি) উঠে (এজলাস থেকে) গেছেন।’
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: [email protected]
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats